দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের অপেক্ষার পর অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারার বহুল প্রতীক্ষিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) প্রকল্প। সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টায় আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের বেলচূড়া এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানকে ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উদ্বোধনী আয়োজনে চার শতাধিক অতিথির উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রকল্পটির সার্বিক পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা তুলে ধরে একটি অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনাও প্রদর্শন করা হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিসিএল) চেয়ারম্যান। এছাড়া বক্তব্য রাখবেন চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, বেজা ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করেন। প্রস্তুতি কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ২০১৪ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন চূড়ান্তকরণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন প্রকল্পটির বাস্তব কাজ শুরু হয়নি।
সম্প্রতি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগে প্রকল্পটিতে নতুন গতি আসে। গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ২৫ জুন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
কর্ণফুলী নদীর মোহনায় আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে গড়ে তোলা হচ্ছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় প্রকল্পটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত শিল্প হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণ থেকে আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এই প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হবে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৪.২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন, ২৫ এমএলডি সক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, দৈনিক ৬০ টন সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চায়না ইকোনমিক জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. শাহেদ বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।”
সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, “কোরিয়ান ইপিজেডের পর চায়না ইকোনমিক জোন আনোয়ারার শিল্পায়নে নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এখানে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিল্পায়নের প্রভাবে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের চেহারা বদলে যাবে। স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
আরএইচ