দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রাম বিএনপি: ক্ষমতা আছে সংগঠন নেই

Riayad
Riayad
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬
পঠিত :
চট্টগ্রাম বিএনপি:  ক্ষমতা আছে সংগঠন নেই

প্রতীকী ছবি

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও সক্রিয় হয়ে উঠেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতাকর্মীরা। সভা সমাবেশে বাড়তে থাকে মানুষের সংখ্যা । লম্বা হয় মিছিলের সারি । তবে গড়ে উঠেনি সাংগঠনিক কাঠামো। এমনকি ১২ ফেব্রুয়ারিতে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও এখানে পূনর্গঠন হয়নি মহানগরসহ তিনটি সাংগঠনিক ইউনিটের নেতৃত্ব । এমনকি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট চট্টগ্রাম উত্তর জেলায় কমিটি নেই প্রায় দীর্ঘদিন ধরে । শক্তিশালী নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা না থাকায় এখানে দলটির কর্মী সমর্থকরাও যেমন খুশি তেমন চলছে । 

 

দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর এবং দক্ষিণ জেলা—এই তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পরিচালিত হয়।এখানে এখন সাংগঠনিক কাঠামো সুগঠিত না থাকলেও আধিপত্য বিস্তার ও পদ-পদবি নিয়ে প্রায়ই দলের ভেতরে ও বাইরে বিরোধের সৃষ্টি হচ্ছে ।এর ফলাফলে দেখা যায় সংঘর্ষও খুনখারাবির । গত ২৩ মাসে চট্টগ্রামে ১৩৬টি খুনের মধ্যে ৫৩ জন বিএনপিও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।এদের বড় একটি অংশ উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান ও সীতাকুণ্ড উপজেলার।

 

তিনটি সাংগঠনিক এলাকায় দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারের মতো ঘটনা থাকলেও সবচেয়ে বেশি বিএনপির নেতাকর্মী খুন হয়েছেন উত্তর জেলার পাঁচ উপজেলায়। এগুলো হলো– রাউজান, সীতাকুণ্ড,মিরসরাই, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি। এরমধ্যে রাউজানের চলমান বিরোধ ও সহিংসতা দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তাই এবার এমন নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে, যারা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে।

 

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকার অনুসারীদের সংঘাত-সংঘর্ষের জেরে গত বছরের ২৯ জুলাই চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্র। এরপর থেকে সাংগঠনিক এই জেলায় দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ কার্যত থমকে আছে। উত্তর চট্টগ্রামের ৭টি উপজেলা ও ৯টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই সাংগঠনিক জেলা বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ বিরোধে সংগঠনটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

 

এদিকে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও শৃঙ্খলাহীনতায় উদ্বিগ্ন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবার নতুন করে দল গোছানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।নতুন কমিটি গঠন ঘিরে ইতোমধ্যে কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন পদপ্রত্যাশী নেতারা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে আলোচনায় রয়েছেন কয়েকজন নেতা।তাঁদের মধ্যে আছেন মিরসরাইয়ের নুরুল আমিন, ফটিকছড়ির কর্নেল (অব) আজিমুল্লাহ বাহার চৌধুরী , সীতাকুন্ডের কাজী সালাহউদ্দিন । এরমধ্যে সাবেক সেনা কর্মকর্তা আজিমুল্লাহ বাহারকে সভাপতি ও কাজী সালাহউদ্দিনকে সেক্রেটারি করে নতুন কমিটি গঠনের জন্য একটি পক্ষ তোড়জোড় করছে বলে জানা গেছে। তবে কাজী সালাহউদ্দিনকে সেক্রেটারি করার বিষয়টি সীতাকুণ্ডের আসলাম চৌধুরীর শপথ নেওয়ার উপর নির্ভর করছে।এক্ষেত্রে পুননির্বাচন হলে সালাহউদ্দিনকে সীতাকুণ্ড ( চট্টগ্রাম ৪) আসন থেকে প্রার্থী করা হবে।সেক্ষেত্রে সেক্রেটারি হিসেবে অন্য কাউকে চূড়ান্ত করা হবে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

 

উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ফটিকছড়ি আসনের বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর বলেন,দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন চান সংঘাতের রাজনীতি থামিয়ে বিতর্কমুক্ত, যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হোক।

 

এদিকে দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৫ সদস্যের আহবায়ক কমিটি থাকলেও সেখানে সাংগঠনিক অবস্থা বেশ নাজুক । বিভিন্ন গ্রুপ -উপগ্রুপে বিভক্ত নেতাকর্মীরা। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটার খেসারতও দিতে হয়েছে তাদের।এই শাখার অধীনস্থ আসনগুলোর মধ্যে ৩টিতে জয় পেয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা । বাকি দুইটি আসনে দাঁড়িপাল্লা জয় হয়। যেখানে চট্টগ্রাম বিভাগের আর বাকি সব আসনে ধানের শীষ জয়লাভ করেছে।@

 

জানা যায়, চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে ইদ্রিস মিয়াকে আহ্বায়ক এবং লায়ন হেলাল উদ্দিনকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে আলী আব্বাসকে। আংশিক এই কমিটিতে যুগ্ন আহবায়ক হয়েছেন লিয়াকত হোসেন ও মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা।এরমধ্যে হেলাল প্রবীণ বিএনপি নেতা জামালউদ্দিন হত্যা মামলার আসামী।আলী আব্বাসের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের বেশ কয়েকটি অভিযোগ আছে। আর কমিটি ঘোষণা দেওয়ার পর পদত্যাগ করেন লিয়াকত আলী।যে কারণে অনেকটা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে এই ইউনিট। গঠিত হয়নি পূর্ণাঙ্গ কমিটি। হতাশা বিরাজ করছে তৃণমূলে। 

 

চট্টগ্রাম মহানগর শাখা বিএনপিরও একই অবস্থা। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক ও নাজিমুর রহমানকে সদস্যসচিব করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।একই বছরের ৪ নভেম্বর এই কমিটির আকার বাড়িয়ে ৫৩ সদস্য বিশিষ্ট করা হয়।তবে এই কমিটিতে দুঃসময়ের অনেক নেতাকর্মীর জায়গা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সেসময় তৈরি হয় ক্ষোভ।যার প্রভাব আছে এখনও। 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা বলেন,'দলের দুঃসময়ে আমরা মাঠে ছিলাম।হুমকি ধমকি উপেক্ষা করে নেতাকর্মীদের নিয়ে এক্টিভ ছিলাম।আর এখন কমিটিতে আমাদের জায়গা হয় না।বিশেষ করে ডা. শাহাদাত, আবুল হাশেম বক্কর ও সুফিয়ান ভাইয়ের সাথে কাজ করা নেতাকর্মীদের কমিটিতে জায়গা হয়নি।ফলে মহানগর সংগঠনও অনেকটা নিষ্ক্রিয়।অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থাও একই।যুবদলের কমিটিও নেই।অনেকটা হযবরল অবস্থা।সহজ করে বললে বর্তমানে এখানে ক্ষমতা আছে,সংগঠন নেই।সুবিধাবাদীদের জয়জয়কার চলছে।আর এটার খেসারত দলকে দিতে হবে।'

 

দলের দুঃসময়ে সরব থাকলেও বর্তমান কমিটিতে জায়গা না পাওয়া নেতাদের একজন ইদ্রিস আলী। মহানগর বিএনপির সাবেক এই দফতর সম্পাদক চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত ও সাবেক নগর সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্করের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।আওয়ামী লীগের আমলে বেশ সক্রিয় থাকলেও এখন নগর কমিটির প্রোগ্রামে তাকে তেমন দেখা যায়না।

 

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ইদ্রিস আলী বলেন, 'আমরা দলের খারাপ সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে ছিলাম।এখন দল ক্ষমতায়। নতুন অনেকেই এখন এসেছে।এসব নিয়ে আমার তেমন আক্ষেপ নেই।দলের একজন নিবেদিত কর্মী হয়েই আছি।'

 

সংগঠনের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ( চট্টগ্রাম) মাহবুবের রহমান শামীম দক্ষিণপূর্বকে বলেন,জাতীয় নির্বাচন হয়েছে কিছুদিন আগে।নির্বাচন কেন্দ্রিক কিছু ব্যস্ততা ও বাস্তবতা ছিলো।এখন আমরা আবার দল গোছানোর দিকে নজর দিচ্ছি।সংসদের এই অধিবেশন শেষে আশা করছি ভালো কিছু দেখবেন।

 

দক্ষিণপূর্ব 

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।