দক্ষিণ পূর্ব

মহান বিজয়ের ৫৪ বছর, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

মনির ফয়সাল
মনির ফয়সাল
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
পঠিত :
মহান বিজয়ের ৫৪ বছর, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। সময় বয়ে চলছে। দেখতে দেখতে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ মহান বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্ণ করেছে। এই দীর্ঘ পথচলায় জাতিকে অর্জন করতে হয়েছে অনেক কিছু, আবার পিছিয়ে পড়তে হয়েছে বহু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে। বিজয় কোনো একক অর্জন নয়; এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া, যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটা জরুরি। প্রশ্ন হলো, যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে এ জাতির জন্ম, তার প্রতিফলন কি আজকের বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে ঘটেছে?

মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির এক সম্মিলিত অঙ্গীকার। জাতি হিসেবে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ, কয়েকটি মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি—এগুলো আমাদের অর্জন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ এখন আর 'তলাবিহীন ঝুড়ি' নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নাম।

তবে, স্বাধীনতার চেতনা শুধু অর্থনৈতিক সূচকে আবদ্ধ নয়। মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। দুঃখের বিষয় হলো, অর্ধশতকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনও সেই কাঙ্ক্ষিত সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ নিশ্চিত করতে পারিনি। যে বহুত্ববাদী রাজনীতির স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেখানে রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার অভাব, দুর্বল নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং বিরোধী দলসমূহকে দমনপীড়নের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বহুলাংশে অনুপস্থিত।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আজও প্রকট। মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এছাড়া, দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং সহজলভ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার যে মৌলিক প্রতিশ্রুতি ছিল, তা আজও সাধারণ মানুষের জন্য অধরা। আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং দীর্ঘসূত্রিতা জনমনে হতাশা সৃষ্টি করেছে।

স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো লাগামহীন দুর্নীতি। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর বিস্তার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছে এবং নাগরিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। দুর্নীতি যেন অলিখিতভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি অংশে পরিণত হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। জাতির এই সংকট কেবল নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, সক্রিয় নাগরিক সমাজের দুর্বলতাও এর জন্য আংশিকভাবে দায়ী। জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা কেবল সরকারের একার কাজ হতে পারে না; এটি একটি জাতীয় সম্মিলিত অঙ্গীকার।

স্বাধীনতার এই শুভক্ষণে আমাদের নতুন করে শপথ নিতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে গুণগত গণতন্ত্র, সুদৃঢ় আইনের শাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায়। যদি আমরা প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি, তবেই স্বাধীনতার স্বপ্ন প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা পাবে।

বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা অপার। অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়িত করার জন্য প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা, সততা এবং দেশপ্রেমের নতুন বীজমন্ত্র। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, জাতি তার সঠিক পথে ফিরে এসে একদিন অবশ্যই স্বাধীনতার মৌলিক লক্ষ্যগুলো পূরণ করবে এবং সেই দিনটির জন্য আমাদের সকলকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে।

জালাল উদ্দিন রুমি
সম্পাদক 
দক্ষিণপূর্ব

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।