দক্ষিণ পূর্ব

‘শতাব্দীর আবিষ্কার’ সাবেত ইঞ্জিন, দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার

Riayad
Riayad
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬
পঠিত :
‘শতাব্দীর আবিষ্কার’ সাবেত ইঞ্জিন, দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার

ছবি

বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে ‘সাবেত অ্যাডভান্সড মোটর’ (এসএএম) নামের এক উদ্ভাবনী ইঞ্জিন। কয়েক বছরের নিবিড় গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের পর জার্মানভিত্তিক ড. সাবেত কনসাল্টিং জিএমবিএইচ এমন একটি ইঞ্জিন তৈরি করেছে, যা কম খরচে উৎপাদন, বহুমুখী জ্বালানি ব্যবহার এবং ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে দরিদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

 

উদ্ভাবক দুই ভাই হুশাং সাবেত ও হুশমান্দ সাবেত শুরু থেকেই এমন একটি ইঞ্জিন তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন, যা মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তাদের ধারণা ছিল, প্রযুক্তির সুবিধা শুধু ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দরিদ্র মানুষের কাছেও পৌঁছাতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তৈরি করা হয়েছে এসএএম।

 

প্রচলিত ইঞ্জিনের তুলনায় এতে অনেক কম যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এটি উৎপাদনে কম খরচসাপেক্ষ, আকারে ছোট, বেশি টেকসই এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বালানিতে পরিচালনা করা সম্ভব। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রচলিত ইঞ্জিনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে এটি বাজারজাত করা যাবে। ইঞ্জিনটির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণকারী এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ একে ‘শতাব্দীর আবিষ্কার’ বলে অভিহিত করেছেন।

 

এসএএম প্রকল্পের পেছনে রয়েছে প্রায় তিন দশকের ইতিহাস। ১৯৯৭ সালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ‘প্ল্যানেটারি কনশাসনেস অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় হুশমান্দ সাবেতের। সেখান থেকেই প্রযুক্তিকে দরিদ্র মানুষের উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ধারণা আরও দৃঢ় হয়।

 

পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে সাবেত পরিবার প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে পরামর্শ করে এমন একটি ইঞ্জিনের নকশা তৈরি করে, যা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত ও উপযোগী হবে। ২০০৮ সালে বার্লিনে এসএএম-এর প্রাথমিক সংস্করণ প্রথমবারের মতো প্রফেসর ইউনূসের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

 

২০১৬ সালে হুশমান্দ সাবেতের মৃত্যুতে প্রকল্পটির অগ্রগতি কিছুটা থমকে গেলেও ২০২০ সাল থেকে তাঁর ছেলে হাফেজ সাবেতের নেতৃত্বে নতুন উদ্যমে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়। প্রযুক্তিটিতে আরও উন্নয়ন আনার পর ২০২৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সোশ্যাল বিজনেস ডে-তে এর অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।

 

এদিকে, এসএএম প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে জার্মানিভিত্তিক ‘সাবেত-ইউনূস ফাউন্ডেশন’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ড. সাবেত কনসাল্টিং ও প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। এই ফাউন্ডেশন প্রযুক্তিটির পেটেন্ট লাইসেন্স সংরক্ষণ করবে এবং বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবসাগুলোর কাছে লাইসেন্স প্রদান করবে, যাতে স্থানীয়ভাবে ইঞ্জিন উৎপাদন ও বাজারজাত করা যায়।

 

ফাউন্ডেশনটি সামাজিক উদ্ভাবন, গবেষণা, শিক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং সামাজিক উদ্যোক্তা তৈরির আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করবে। উইকিউ ইনস্টিটিউট এর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে।

 

বাংলাদেশে এসএএম প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ইতোমধ্যে ড. সাবেত কনসাল্টিং জিএমবিএইচ, গ্রামীণ হেলথকেয়ার ট্রাস্ট এবং উইকিউ ইনস্টিটিউট জিজিএমবিএইচের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনভিত্তিক একটি সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগ গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলছে।

 

অংশীদাররা বাংলাদেশে অন্তত ২০০টি এসএএম ইউনিট নিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে একমত হয়েছেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির কারিগরি সক্ষমতা, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং বাস্তব ব্যবহারিক সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসএএম একটি জ্বালানি-নিরপেক্ষ প্রযুক্তি। এটি বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করে যান্ত্রিক শক্তি, বিদ্যুৎ এবং কুলিং এনার্জি উৎপাদন করতে সক্ষম। ফলে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

উদ্যোক্তাদের আশা, বাংলাদেশে সফলভাবে এই প্রযুক্তির বাস্তবায়ন সম্ভব হলে তা শুধু পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতেই নয়, সামাজিক ব্যবসা ও স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

আর এইচ 

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।