নিজস্ব প্রতিবেদক
এক সময়ের জনপ্রিয় কুটির শিল্প শীতল পাটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। বাংলার গ্রীষ্মকালীন ঐতিহ্যের প্রতীক এই পাটি শুধু আরামদায়কই নয়, শতবর্ষী সংস্কৃতিরও বাহক। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারাতে বসেছে এই ঐতিহ্য, এবং প্রতিবছরই এই শিল্প থেকে বিদায় নিচ্ছেন অনেকে।
চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে আয়োজিত ঐতিহাসিক জব্বারের বলী খেলা উপলক্ষে বসে জমজমাট মেলা।প্রতিবছর এই মেলায় শতাধিক শীতল পাটি বিক্রেতা আসলেও এবার আসেননি তেমন।জানা যায়,এবারের মেলায় মাত্র ৩০ জন বিক্রেতা শীতল পাটি নিয়ে এসেছে। তবে তাদেরকে আগের বছরের চেয়েও বেশি লোকসানে পড়তে হয়েছে। তিনদিন ব্যাপী এ মেলায় অন্যান্য ব্যবসা জমলেও জমেনি শীতল পাটির ব্যবসা। কোনমতেই গাড়ি, ভাড়া, খাওয়া দাওয়ার অর্ধেক খরচ না তুলেই চট্টগ্রাম ছেড়েছেন তারা।
জানা যায়,একেকজন বিক্রেতা কমপক্ষে শতাধিক পাটি বাসে, ট্রেনে নিয়ে আসেন। আর লালদিঘির পাড়ে পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রির আশায়। কিন্তু তাদের সবারই মাথায় হাত।বিক্রি এতো কম হয়েছে যে, হোটেলে থাকার ও খাওয়ার টাকাও শোধ করতে পারেননি। মনের দুঃখে অনেকে এ পেশা ছাড়ার কথাও জানিয়েছেন।
কথা হলো শেষবারের মতো মেলায় অংশ নিতে আসা বরিশালের গণেশ দত্তের সঙ্গে। তিনি বললেন, "আর কখনও আসব না, এবার নিজের হাতেই পরিসমাপ্তি টানছি।আর আমার সন্তানেরাও আর এই পেশায় যুক্ত হতে আগ্রহী নন।'
গণেশ জানান, ৩৫ শতাংশ জমিতে পাটি গাছ চাষ করেছেন, তবে লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না। তিন জন কর্মীর শ্রমে তৈরি এক একটি পাটির খরচ পড়ে প্রায় ১,২০০ টাকা। অথচ ক্রেতারা সেই দামে কিনতে নারাজ। গত দুদিনে তার বিক্রি ২০ হাজার টাকাও ছাড়ায়নি, যেখানে মেলায় অংশ নিতে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকার হাজারের বেশি।
গণেশ চন্দ্র দত্ত আরো বলেন, পাটিগুলো বানাতে সারাদিন গৃহস্থ মহিলারা কাজ করে। আর পুরুষরা পাটি ক্ষেতে কঠোর পরিশ্রমে ঘাম ঝরায়। একেক জনকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি দেয়া হয়। এরপরও তাদের সংসার চলে না। কারণ এর বেশি মজুরি দিলে মালিকের পোষাবে না। এভাবে প্রতিটি ছোট পাটিতে খরচ পড়ে ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা, মাঝারিগুলোতে ১৫'শ থেকে ২ হাজার থেকে আর বড় আকারের পাটিতে আড়াই হাজার তিন হাজার টাকা। অথচ আজকাল এসব দামে শীতল পাটি ক্রয় করছে না। দিন দিন কদর হারাচ্ছে শীতল পাটি।
শুধু গণেশই নন, বরিশাল, ভোলা, সিলেট ও সিরাজগঞ্জের অন্যান্য পাটি শিল্পীরাও একই দুর্দশায় ভুগছেন। একসময় ঘরে ঘরে চলা এই শিল্প এখন প্লাস্টিক ও সস্তা বিকল্প পণ্যের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে।
সিলেটের কালাচান দাস বলেন, আমাদের অঞ্চলের শীতল পাটিই সবচেয়ে বিখ্যাত। আমাদের এলাকায় শীতল পার্টির আলাদা পল্লী রয়েছে। গ্রামে অন্তত শতাধিক পরিবার শীতল পাটি বুননের সঙ্গে জড়িত। তারা কেবলই শীতল পাটি বানিয়ে রোজগার করে সংসার চালান।
তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় পাহাড়ি জঙ্গলে শীতলপাটি চাষ করা হয়। প্রথমবার গাছ লাগানোর পর বড় হতে তিন বছর লাগে। প্রথম পর্যায়ে (নতুন করে লাগালে) তিন বছরে আমরা একবার বেত কেটে নিয়ে আসি। এরপর থেকে প্রতিবছর বেত কাটা যায়। বেতগুলো পানিতে ভিজিয়ে এরপর গরম পানিতে সিদ্ধ করা হয়। তারপর এগুলোকে চেঁচেঁ চিকন আঁশ বের করা হয়। এরপর শৈল্পিক রূপ দিয়ে নানা ডিজাইনের শীতল পাটি বানানো হয়।
তিনি আরও বলেন, শীতল পাটির উপর বাংলাদেশের মানচিত্র, হাঁস মোরগ, গরু, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া সবকিছু আঁকতে পারি। তবে আজকাল আমাদের এসবের কদর কেউ করছে না। চিন্তাভাবনা করছি ছেড়ে দেব। কিন্তু এ কাজের প্রতি মায়া বসে গেছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা পাটির কাজের সাথে জড়িত। বংশপরম্পরায় আমরা এই শিল্পকে লালন করে আসছি। এখন আমাদের মজুরি খরচ হচ্ছে না। কোনভাবেই আমরা পোষাতে পারছি। একেকটি পাটি বানাতে খরচ হয় ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা। আর ক্রেতারা তারা মূল্যায়ন করছে ৮০০ - ৯০০টাকা।
ভোলা থেকে আসা শাহ আলম বলেন, প্রতিটি পাটিতে কয়েক পর্বের কাজ থাকে। কয়েকজনের হাত ঘুরে পাটিগুলো বাজারে আসে। শীতল পাটিতে ঘুমাতে এতো আরাম যা বলার ভাষা নেই। শীতল পাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তুলতুলে নরম থাকবে, এটিকে চিকন ভাঁজ করে অনেক ছোট করে ফেলা যাবে। শুধু তাই নয় শীতলপাটির ফিনিশিং থাকবে অন্যরকম। দেখলে মনে হবে এটি শীতল পাটি।
স্থানীয় সাংবাদিক মনির হোসেন বলেন,যুগ যুগ ধরে কুটির শিল্পে দাপট দেখিয়েছে শীতল পাটি। এই পাটির কদর এতো বেশি ছিল যে আগেকার দিনে বিয়ে-সাদীতে শীতল পাটি না দিলে মনমালিন্য দেখা দিতো। এক যুগ আগেও মেয়ের বিয়ের আগেই মায়েরা শীতল পাটি বানিয়ে তুলে রাখতো সযত্নে। কিংবা হাঁস, মুরগি, ডিম বিক্রি করে শীতল পাটি কিনে নিতো বিয়েতে দেবেন বলে। দু:খজনক হলেও সত্য, সেই শীতল পাটির কদর এখন দিনদিন কমছে। এতোটাই কমছে যে এখন আর শীতল পাটি কেউ কিনছেই না, বরং দেখেই স্বাদ মিটাচ্ছে। আগ্রহও হারিয়েছেন অনেকে। এর অন্যতম কারণ শীতল পাটির সুবিধা সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম না জানা, শহুরে জীবন ব্যয়বহুল, ব্যস্ততা, প্লাস্টিকের আধিক্য, সাধ্যের বাইরে দাম। তাইতো প্রতিবছরই ধুঁকে ধুঁকে ব্যবসা চালিয়ে নিলেও নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন অনেকে শিল্পী।