জালাল রুমি
সাংবাদিকতা মানেই শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়। কিছু কিছু সময়ে এটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। হয়ে ওঠে নিজের বুক পেতে দিয়ে আরেকটি জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। বাংলাদেশের আকাশ-বাতাসে তখন আগুন। আর চট্টগ্রামও ছিল সেই আগুনের কেন্দ্রবিন্দুতে। পাঠকপ্রিয় দৈনিক মানবজমিন-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো ইনচার্জ হিসেবে সে সময় আমি রিপোর্টিংয়ে নেমেছিলাম। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝলাম, এখানে শুধু সংবাদ লিখলেই চলবে না; এখানে মানুষও বাঁচাতে হবে। সেই ৪৫ দিন আমার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর, আবার সবচেয়ে গৌরবের অধ্যায়।
১৬ জুলাই, নগরের মুরাদপুর। সেদিন রাজপথ রক্তে ভিজেছিল। সকাল থেকেই পরিবেশ ছিল থমথমে। দুপুর গড়াতেই মুরাদপুর পরিণত হলো রণক্ষেত্রে। চারপাশে শুধু টিয়ারশেলের ঝাঁঝালো গন্ধ, কানে তালা লাগিয়ে দেওয়া সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ, আর থেমে থেমে বুলেটের গর্জন। আকাশজুড়ে কালো ধোঁয়া, নিচে মানুষের ছোটাছুটি আর আর্তনাদ। আমি কয়েকজন সহকর্মীসহ ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ছিলাম। চোখের সামনে দেখলাম, একের পর এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়ছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পথঘাট। কেউ পানি চাইছে, কেউ ‘মা’ বলে চিৎকার করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম, আজকের দায়িত্ব শুধু অফিসের জন্য সংবাদ সংগ্রহ নয়; এর চেয়েও বড় কিছু। সেদিন আমি শুধু একজন রিপোর্টার ছিলাম না, একজন ভাইও ছিলাম। নিজের দুই হাতে আহতদের তুলে নিয়েছি। জামা ছিঁড়ে ক্ষত চেপে ধরে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করেছি। গুনিনি কতজনকে সাহায্য করেছি—পাঁচজন, সাতজন, নাকি আরও বেশি। শুধু জানতাম, এক মিনিট দেরি হলেই হয়তো তারা বাঁচবে না। সামনে যে যানবাহন পেয়েছি—সিএনজি, পিকআপ কিংবা অন্য কোনো গাড়ি—তাতেই তুলে দিয়েছি। গন্তব্য ছিল একটাই, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। যে হাত দিয়ে প্রতিদিন কলম ধরি, সংবাদ লিখি, সেই হাতই সেদিন রক্তে রাঙা হয়ে গিয়েছিল।
জুলাইয়ে আমরা সাংবাদিকরা আরেকটি লড়াইয়ে নেমেছিলাম—সত্যকে বাঁচানোর লড়াই। গুলি থামার পর নেমে এল আরেক দানব। সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলো। গোটা জাতিকে তথ্যের অন্ধকারে বন্দি করে রাখার চেষ্টা করা হলো, যাতে মানুষ জানতে না পারে রাজপথে কী ঘটছে। কিন্তু সত্য কি কখনো বন্দি থাকে?
নেট নেই, মোবাইলে কল যায় না, চারদিকে গ্রেপ্তারের আতঙ্ক। তারপরও আমরা থেমে থাকিনি। চট্টগ্রাম শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হেঁটেছি। রিকশায়, লোকাল বাসে, কখনো পায়ে হেঁটে তথ্য সংগ্রহ করেছি। ছবি তুলেছি, ভিডিও করেছি। নানা কৌশলে বিভিন্ন জায়গা থেকে সেই ফুটেজ ও প্রতিবেদন ঢাকার অফিসে পাঠিয়েছি। অনেক কষ্ট হয়েছে, অনেক ভয়ও লেগেছে। কিন্তু থেমে থাকলে সত্যটাই হারিয়ে যেত। আর সত্য হারিয়ে গেলে এই তরুণদের আত্মত্যাগও বৃথা হয়ে যেত।
যদিও সে সময় অনেক সাংবাদিক সত্য লেখার সাহস করেননি। তবে আমরা কয়েকজন লিখেছি। অসংখ্য হুমকি-ধমকির পরও লিখেছি। কারণ আমরা জানতাম, আমরা মিথ্যা লিখছি না। আমরা অন্যায়ের পক্ষ নিইনি। তবু প্রতিটি সকাল ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা।
সে সময় প্রায় প্রতিদিনই ছিল একই গল্প। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মা-বাবা কিংবা স্ত্রীকে বলতাম না, ‘সন্ধ্যায় ফিরব।’ কারণ আমি নিজেই জানতাম না, আদৌ ফিরতে পারব কি না। একদিকে স্বৈরাচারী সরকারের রক্তচক্ষু, অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজরদারি ও হুমকি।
চট্টগ্রামের রাজপথে আমাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা কম হয়নি। ফোনে হুমকি, অফিসে নজরদারি—সবই ছিল। কিন্তু থেমে থাকিনি। কারণ বিবেকের কাছে আমি পরিষ্কার ছিলাম। পেশাগত দায়িত্বের চেয়েও বড় ছিল মানবিক দায়িত্ব।
৪ আগস্ট বিকেল। সরকার পতনের ঠিক আগের দিন। নগরের কাজির দেউড়িতে সিজেকেএসে অবস্থিত আমাদের অফিসে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা আসেন। তারা আমার সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। পরে জানতে পারি, ‘আমিসহ কয়েকজন সাংবাদিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন’—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তারা আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। আমাদের পেশারই কয়েকজন ব্যক্তি নাকি এমন অপতথ্য ছড়িয়েছিলেন। তবে সেদিন আমি অফিসে না থাকায় অল্পের জন্য রক্ষা পাই।
সাংবাদিকতা পেশায় পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। তবে নৈতিক দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই সত্য লেখার চেষ্টা করেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল জাগরণ, একটি মহাবিপ্লব। সেই বিপ্লবের দিনগুলোতে চট্টগ্রামের রক্তাক্ত রাজপথে দাঁড়িয়ে আমি দুটি কাজ করেছি—এক. সত্যের পক্ষে কলম ধরেছি। দুই. মৃত্যুর মুখ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। একজন সাংবাদিকের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?
আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন পেছনে তাকাই, বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। গুলির মুখে দাঁড়িয়ে যে সাংবাদিকতা করেছি, সেটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পদক। যারা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। আর যারা বেঁচে আছেন, তাঁদের জন্য দোয়া। আমরা যেন আর কখনো এমন দিন না দেখি।
লেখক
ব্যুরো ইনচার্জ, দৈনিক মানবজমিন, চট্টগ্রাম
সম্পাদক, দক্ষিণপূর্ব ডটকম