দক্ষিণ পূর্ব

জুলাই বিপ্লবের গৌরবগাঁথায় নতুন বাংলাদেশ

shakhawat sohan
shakhawat sohan
প্রকাশ : ৬ আগস্ট ২০২৫
পঠিত :
জুলাই বিপ্লবের গৌরবগাঁথায় নতুন বাংলাদেশ
ডঃ ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

এটি সর্বজনবিদিত যে, দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বাংলার আপামর জনসাধারণের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক-বৈষম্যমুক্ত মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। হৃদয় গভীরে উক্ত উপলব্ধিকে শাণিত করেই পাকিস্তানি হায়েনাদের শাসন-শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বাঙালি জাতি। পাকিস্তানের বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘসময় ধরে বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। স্বাধীন সত্ত্বার বিপরীতে পরাধীনতার গ্লানি পরিহার করে মূলতঃ ১৯৪৮ সাল থেকেই বাঙালি জাতি মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদাসীন করার অপোষহীন ব্রত গ্রহণ করে। বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন মহান স্বাধীনতার রোডম্যাপ তৈরিতে যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে প্রতিভাত। ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ এর ৬ দফা ও পরবর্তীতে ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের সাবলীল গতিধারায় একাত্তরের মার্চ বাঙালির স্বাধীনতার নতুন পথপরিক্রমা উন্মুক্ত করে। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ফলশ্রুতিতে যে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল তার যথাযথ মূল্যায়ন-বাস্তবায়ন কতটুকু কার্যকর ছিল তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। জনগণ ক্ষমতার উৎস বলে জনগণের অতি কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাৎ-পাচার, ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি-দুর্নীতির মহাযজ্ঞে বাংলাদেশকে গিলে খেয়েছে। লাখ লাখ কোটি টাকা পাচারের বিষয়টি এখন আর কারো অজানা নয়। এত বিশাল পরিমাণ অর্থ পতিত সরকারের পরিবারকেন্দ্রীক সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় কিভাবে মাফিয়াচক্রের মাধ্যমে লুটপাটে ব্যতিব্যস্ত ছিল জনগণ তা ধীরে ধীরে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল-পেশাজীবী-শিক্ষাবিদ-কলামিষ্টদের কণ্ঠরোধে নানামুখী দমন-পীড়ন-গুম-খুন-হত্যা ইত্যাদির নগ্নরূপ জাতি করুণ বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছে। যৎসামান্য বিরোধীতাকারীদেরও ফাঁসিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সংস্থাকে লেলিয়ে দিয়ে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তৈরি করা হয়। যার কথিত তদন্ত অনুসন্ধান এখনও অব্যাহত রয়েছে। 

অনস্বীকার্য যে, বিগত ৫৩ বছরে ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহের পারস্পরিক বোঝাপড়ার সর্বজনীন কোন জাতীয় আদর্শ নির্মিত হয়নি। সরকার গঠন করে নিজেদের ভাগ্যকে তারা সুপরিসর করেছে। জনগণের সার্বিক কল্যাণে তেমনকিছু দৃশ্যমান নয়। দেশপ্রেমিক-মেধাবী-তরুণ-প্রৌঢ় নিবেদিত ব্যক্তিদের মূল্যায়ন দূরে থাক অবমূল্যায়নের কষাঘাতে দেশ ছিল ক্ষত-বিক্ষত। প্রত্যেক নাগরিকের বিভিন্ন মান-অভিমান-ক্ষোভ-ক্রোধ স্বাভাবিক জীবনযাপনে অস্বাভাবিক প্রতিবন্ধকতা, গুন্ডাতন্ত্রের ভয়াবহ দৌরাত্ম্য পুরো দেশকে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। দুঃশাসনের ভয়াবহ প্রভাবে সততা-স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার নির্বাসন ছিল বিগত সরকারের কুৎসিত অপকৌশল। তদুপরি আইনের শাসনের অপব্যবহারে পর্যুদস্ত ছিল পুরো জাতি। অর্থনীতিকে পঙ্গু করার গুটিকয়েক মন্ত্রী-এমপি-ব্যবসায়ী-আমলাদের সিন্ডিকেটের ভয়ংকর আচরণ ছিল অবিশ্বাস্য। প্রচন্ড বৈষম্যের প্রতিকূলে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে কালক্রমে জনগণের সচেতনতা-প্রতিবাদী রূপ পরিগ্রহ করে। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনের শক্তি পুঞ্জিভূত হয়। ক্ষোভের মাত্রা অপরিমেয় পর্যায়ে পৌছে গেলে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জাতির চেতনাবোধ নবতর অধ্যায় রচনা করে।

ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করলে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। নিয়ম ভেঙ্গে মেধা-প্রজ্ঞার অবজ্ঞায় সরকারি ও বেসরকারি সকল স্তরের চাকরিতে নিয়োগের এই অযৌক্তিক প্রাচীর ভাঙ্গার অঙ্গীকার ছিল বলিষ্ঠ। ৬ জুন থেকে দেশের নানা প্রান্তে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আলোড়নে ছাত্র-জনতার সীমাহীন ক্ষোভ-যন্ত্রণা ও বৈষম্যের আর্তনাদ ব্যাপক দ্রোহে রূপান্তর ঘটে। স্ফুলিঙ্গের মত পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের বিস্ফোরণ। এতে স্বৈরচারী শাসকের হৃদয়ে প্রচন্ড কম্পন সঞ্চার করে। ক্ষমতা-অর্থলোভের অপরিসীম কদর্য মোহে যারা অহংকার-দাম্ভিকতাকে পরিপূর্ণ ধারণ করেছিল তাদের মসনদ ধরে রাখার ভিতকে কাঁপিয়ে তুলে। স্বল্প সময়ের মধ্যে বৈষম্য বিরোধী যৌক্তিক ছাত্র আন্দোলন গণজাগরণ তৈরি করে। ছাত্র-জনতার উপর গুলিবর্ষণের ঘটনা এবং নানামুখী দমন-পীড়নের ফলশ্রুতিতে এটি সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। ৩ আগষ্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক এবং সরকার পদত্যাগের এক দফা আন্দোলন ঘোষিত হয়। ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অবিনাশী প্রয়াস গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হলে ৫ আগষ্ট সরকারের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে পনের বছরেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসান হয়। প্রায় দেড় হাজারের অধিক শহীদান ও কয়েক হাজার জীবনের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে অর্জিত হয় নতুন বাংলাদেশ।  

সর্বস্তরের জনগণের অভাবনীয় সমর্থনে সফল অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে গঠিত হয় অন্তর্র্বতীকালীন সরকার। বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব শান্তিতে নোবেলজয়ী খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সরকার গঠনের পরপরই মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীর উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে ঘোষণা করেন সকল অরাজকতা কঠোর হস্তে দমন করার দৃঢ় প্রত্যয়। স্বাধীনতার মুক্ত বাতাস যেন প্রত্যেকে বুক ভরে নিতে পারে তিনি সেই নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। মহান স্রষ্টার অপার মহিমায় স্বল্প সময়ের মধ্যেই উদ্ভূত সহিংসতা-বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা প্রায় নিয়ন্ত্রণে এনে সরকার কর্তৃক ঘোষিত হয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কারের নানামুখী পরিকল্পনা। অন্তর্র্বতী সরকারের গৃহীত সকল পদক্ষেপ দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সরকার পরিচালনার শুরুতে বিচার বিভাগের সংস্কার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধান বিচারপতি,  আপিল বিভাগের বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ বিচার বিভাগের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ সুসম্পন্ন হওয়ায় ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে দেশের আপামর জনগণের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ দেশে বিদ্যমান সকল কালো আইনের তালিকা প্রণয়ন করে দ্রুত এসব আইন বাতিল বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধনের আশ্বাস প্রদান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল। বাংলাদেশের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ‘মনসুন অভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, ‘আগামীতে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষকে মুক্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে তারুণ্যের এই অভ্যুত্থান প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।’ 

জুলাই বিপ্লবে ভূমিকা পালনকারী এবং এটিকে সার্থক করার পিছনে যারা অবদান রেখেছিল তাদের সমন্বয়ে ইতিমধ্যে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। জুলাই গণঅব্যুত্থানে সংঘটিত নৃশংস সহিংসতার নির্দেশদাতা ও দায়ীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে শাস্তি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে নতুন পার্টির শুভ সূচনা। আত্মপ্রকাশে আবেগ ও আনন্দঘন অনুভূতিতে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে উচ্চারিত হয় সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা, এ দেশে ভারত-পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির ঠাঁই না দেওয়ার প্রত্যয় এবং গণহত্যায় দায়ীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান উল্লেখ্য বিষয়সমূহ প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন নতুন দলের আহ্বায়ক জনাব নাহিদ ইসলাম। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি জানান, তাঁরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ চান, যেখানে সমাজে ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বিভেদের বদলে ঐক্য, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার এবং পরিবারতন্ত্রের বদলে মেধা ও যোগ্যতার মানদন্ড প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁদের রাজনীতিতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান হবে না।

অতিসম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়া সনদের পটভূমিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে সাম্য-মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের নীতিকে ধারণ করে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের আকাঙ্খা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘ ৫৩ বছরেও তা অর্জন করা যায়নি। কারণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও সংস্কৃতি বিকাশের ধারা বারবার হোঁচট খেয়েছে। খসড়ায় রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সাত দফা অঙ্গীকারনামা। মূলতঃ এতে ২৪ এর বৈষম্যবিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সংবিধানে যথাযোগ্য স্বীকৃতি দেওয়ার কথা কলা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার বিষয়ে কিছু প্রস্তাব রয়েছে, যা সনদ গৃহীত হওয়ার পর নির্বাচিত সরকার দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। সার্বিক বিবেচনায় ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। উদ্দীপ্ত তারুণ্যের অবিস্মরণীয় নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল যুগান্তকারী। এটি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব দরবারে নতুন প্রত্যয়ের অনুপ্রাণিত এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। মোদ্দাকথা জুলাই বিপ্লবের চেতনা পরিপূর্ণ ধারণ করে যথার্থ অর্থে নতুন বাংলাদেশ গড়ে ওঠবে- আজকের দিনে এটিই প্রত্যাশিত। 

লেখক: শিক্ষাবিদ, সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।